
ধুপছায়া ডেস্ক :
ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির কিংবদন্তি, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন। মৃ/ত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
১ জুন (সোমবার) বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃ/ত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তোফায়েল আহমেদের জামাতা তৌহিদুজ্জামান তুহিন ও স্ত্রীর বড় ভাই মামুন তালুকদার শেখ।
স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রবীণ এই রাজনীতিক দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতায় ভুগছিলেন। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রায় আট মাস আট দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রায়হান রাব্বানীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন তিনি। সোমবার বেলা সাড়ে ৩টায় তাঁর জীবনের অবসান ঘটে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। ভোলা সরকারি হাই স্কুল ও বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করেন এবং বঙ্গবন্ধুর ৬ দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ঊনসত্তরের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তরুণ নেতা তোফায়েল আহমেদ।
মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় রাজনীতিতে অবদান
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক চার প্রধানের একজন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তিনি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে বাকশালের যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগ’-এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হ/ত্যাকাণ্ডের পর তোফায়েল আহমেদকে গ্রে/প্তার করে দীর্ঘ ৩৩ মাস কারান্তরালে রেখে অমানুষিক নি/র্যাতন করা হয়। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে তিনি দলের সভাপতিমণ্ডলীর (প্রেসিডিয়াম) সদস্য হন এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তোফায়েল আহমেদ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মোট ১২ বার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৯ বার সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন ছাড়াও স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী এবং ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৬৪ সালে তিনি আনোয়ারা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র সন্তান ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী পেশায় একজন চিকিৎসক।
এই মহান নেতার প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
সূত্র: বিডি নিউজ