
বিশেষ প্রতিনিধি
জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীনস্থ ১০৩টি ‘প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র’-এ প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, দাপ্তরিক জবাবদিহিতার অভাব এবং ‘প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’ লঙ্ঘনের তীব্র অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রগুলোর প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনপ্রতিষ্ঠা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত সেবাদান নিশ্চিত করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নিকট স্মারকপত্র প্রদান করেছে ‘বাংলাদেশ ডিজেঅ্যাবিলিটি অ্যাফেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (BDAOA)।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে উত্থাপিত মূল অভিযোগ ও দাবিসমূহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্তৃত্বের দ্বৈততা এবং নিয়ন্ত্রণহীনতা
’প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’, কার্যপরিধি ও পরিপত্র (স্মারক নং- ১১৪/২০১১-১০৭, তারিখ: ২৬/০১/২০১২) অনুযায়ী কেন্দ্রের ‘অফিস প্রধান’ হিসেবে ‘প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা’-এর প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট। পূর্বে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কনসালটেন্ট (ফিজিওথেরাপি)-গণ প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তার নিকট থেকেই ছুটি গ্রহণ, অবমুক্তি ও যোগদান সম্পন্ন করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি চিঠির মাধ্যমে উক্ত বিধান বাতিল করে কনসালটেন্টদের ছুটি অনুমোদন ও বিল-ভাউচারে যৌথ স্বাক্ষরের এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রে চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও দ্বৈত শাসনের সৃষ্টি হয়েছে, যা চেইন অব কমান্ড বিনষ্ট করছে।
২. কনসালটেন্টদের সেবামূলক দায়িত্ব ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অসঙ্গতি
কনসালটেন্ট (ফিজিওথেরাপি)-দের মূল দায়িত্ব হলো কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক অবস্থান করে সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যক্ষ ফিজিওথেরাপি ও ক্লিনিক্যাল সেবা প্রদান করা। অন্যদিকে, কেন্দ্রের সামগ্রিক নীতি নির্ধারণ, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং জেলা/উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটিতে ‘অফিস প্রধান’ হিসেবে অংশ নেওয়ার বিধিসম্মত এখতিয়ার প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তার। ক্লিনিক্যাল দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের এসব প্রশাসনিক সভায় পাঠানোয় একদিকে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা, অন্যদিকে নীতিমালার চরম লঙ্ঘন হচ্ছে।
৩. সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ‘ডাঃ’ পদবি ব্যবহার
মন্ত্রণালয় ও দপ্তর থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কনসালটেন্টগণ বেআইনিভাবে ‘ডাঃ’ পদবি ব্যবহার করে আসছেন। এ বিষয়ে প্রধান কার্যালয় কিংবা মাঠ পর্যায় থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে স্মারকপত্রে উল্লেখ করা হয়।
৪. শূন্য পদে বিধি বহির্ভূতভাবে দায়িত্ব পালন
কোনো কার্যালয়ে প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তার পদ শূন্য হলে নিয়ম অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী অফিসের কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করার কথা। কিন্তু সেবা কেন্দ্রগুলোতে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো অফিস আদেশ ছাড়াই কনসালটেন্ট (ফিজিওথেরাপিস্ট)-দের উক্ত পদে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হচ্ছে।
৫. ফিজিওথেরাপিস্টগণের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড ও অনুপস্থিতি
অভিযোগ করা হয়েছে যে, বিশেষ সুবিধা পাওয়ায় ফিজিওথেরাপিস্টদের একটি অংশ চরম স্বৈরাচারী ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠেছেন। মন্ত্রণালয় থেকে বদলির আদেশ হলে রীট (মামলা) দায়ের করা, ছুটি না নিয়ে অনুপস্থিত থাকা, দুপুরে অফিস না করে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী পাঠানো এবং প্রথাবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার মতো গুরুতর অনিয়মের কথা স্মারকপত্রে বলা হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনের ৫-দফা দাবি:
পরিস্থিতি নিরসনে অ্যাসোসিয়েশন থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর কাছে ৫টি নির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে:
১. নীতিমালা পরিপন্থী অফিস আদেশ বাতিল: ‘প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’ ও পরিপত্রের পরিপন্থী সমস্ত সম্প্রতিক অফিস আদেশ অবিলম্বে বাতিল করা।
২. একক কর্তৃত্ব পুনর্বহাল: ‘অফিস প্রধান’ হিসেবে প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তার একক প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্তৃত্ব (ছুটি মঞ্জুর, যোগদান, অবমুক্তি, ছুটি তদারকি) পূর্বের ন্যায় সুনির্দিষ্ট করা।
৩. সার্বক্ষণিক থেরাপি সেবা নিশ্চিত করা: কনসালটেন্টদের কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক থেরাপি সেবা দেওয়া নিশ্চিত করা এবং জেলা/উপজেলা উন্নয়ন সভায় কেবল ‘অফিস প্রধান’ হিসেবে প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তার প্রতিনিধিত্ব বহাল রাখা।
৪. এসিআর প্রদান ও তদারকি কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ: প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তার অধীনস্থ কনসালটেন্ট, টেকনিশিয়ান ও ক্লিনিক্যাল কর্মচারীদের এসিআর এবং কার্যমূল্যায়ন কাঠামোগতভাবে সুনির্দিষ্ট করা।
৫. জরুরি নির্দেশনা জারি: ১০৩টি কেন্দ্রে দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে এনে সেবাগ্রহীতাদের সেবাদান নিশ্চিত করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অবিলম্বে জরুরি নির্দেশনাবলী জারি করা।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ কারকোবাদ আকুঞ্জী এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবুল হাসেম স্বাক্ষরিত এই স্মারকপত্রটিতে অনুলিপি হিসেবে অতিরিক্ত সচিবকেও (প্রশাসন) দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।