
নিজস্ব প্রতিবেদক – ঢাকা
প্রশাসনের গতিশীলতা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিতর্কিত ভূমিকা পালন এবং বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সপক্ষে বা বিপক্ষে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের অন্তত ৬৬ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই তালিকায় রয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পুলিশ ক্যাডারের ৩৩ জন স্পেশাল পারপাস বা পুলিশ সুপার (এসপি) এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৩৩ জন সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি)।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই কর্মকর্তারা সবাই বিসিএস ২০তম ব্যাচের সদস্য। তারা ২০০১ সালের ৩১ মে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেছিলেন। সেই হিসেবে চলতি বছরের ৩০ মে তাদের প্রত্যেকের চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে।
আইনি বাধ্যবাধকতা: সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী— কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে, সরকার জনস্বার্থে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তাকে চাকরি থেকে অবসর প্রদান করতে পারে। এই আইনি ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শিগগিরই এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
তালিকায় থাকা আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তাগণ
বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া ৩৩ পুলিশ কর্মকর্তার একটি বড় অংশ বর্তমানে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে আছেন এবং কেউ কেউ সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন। তালিকায় থাকা কয়েকজন হাইপ্রোফাইল কর্মকর্তা হলেন:
মো. হারুন অর রশীদ: সাবেক ডিবি প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার, যিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় নারায়ণগঞ্জের এসপি ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি বর্তমানে পলাতক ও সাময়িক বরখাস্ত।
শাহ মিজান শাফিউর রহমান: নির্বাচনের সময় ঢাকা জেলার এসপি এবং পরবর্তীতে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি।
সৈয়দ নুরুল ইসলাম: নির্বাচনের সময় কুমিল্লার এসপি ও আন্দোলনকালীন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি।
জিহাদুল কবির: চাঁদপুর ও বরিশালের সাবেক পুলিশ কমিশনার।
নূরে আলম মিনা ও ইলিয়াছ শরীফ: যথাক্রমে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর তৎকালীন এসপি।
এছাড়াও এই তালিকায় মিরাজ উদ্দিন আহমেদ, ড. শামসুন্নাহার, সাইফুল ইসলাম, মাশরুকুর রহমান খালেদসহ আরও বেশ কয়েকজন সাবেক জেলার এসপিদের নাম রয়েছে।
আতঙ্কে সাবেক ৩৩ জেলা প্রশাসক (ডিসি)
একই ব্যাচের (২০তম) বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের যেসব কর্মকর্তা ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন জেলায় রিটার্নিং কর্মকর্তা বা ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তারাও এই আদেশের আওতায় আসছেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে তারা সবাই ওএসডি অবস্থায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যুগ্মসচিব হিসেবে কর্মরত আছেন।
তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য ডিসিবৃন্দ:
চাঁদপুরের মো. মাজেদুর রহমান , পটুয়াখালীর মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী, পঞ্চগড়ের সাবিনা ইয়াসমিন, মেহেরপুরের ড. আতাউল গনি, পিরোজপুরের আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন, সিলেটের এম কাজী এমদাদুল ইসলাম (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত), সাতক্ষীরার এস এম মোস্তফা কামাল, কুড়িগ্রামের মোছা. সুলতানা পারভিন, খুলনার মো. হেলাল হোসেন এবং নরসিংদীর সৈয়দা ফারহানা কাউনাইনসহ মোট ৩৩ জন।
স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, বিতর্কিত ভূমিকার কারণে এই কর্মকর্তাদের দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ওএসডি করে রাখা হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং স্বচ্ছ করতে সরকারের এই চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।