
কৃষ্ণ গোপাল সেন, রূপসা (খুলনা):
গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং যুবসমাজকে মাদকসহ সকল সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রেখে সুস্থ বিনোদন ও ক্রীড়াচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার প্রত্যয় নিয়ে খুলনার রূপসায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা। প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও উপজেলার শ্রীফলতলা ইউনিয়নের ডোমরা যুবসংঘের উদ্যোগে এই মেলার আয়োজন করা হয়।
আজ ৩১ মে (রবিবার) বিকেলে ডোমরা পুটিমারি বিলে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে পুরো এলাকায় এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আগত বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে গোটা এলাকা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আগত দক্ষ অশ্বারোহীরা অংশ নেন। ঘোড়ার দুরন্ত গতি আর আরোহীদের নৈপুণ্য উপস্থিত দর্শকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। গ্রামীণ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ এই ঘোড়দৌড় স্থানীয় জনগণের কাছে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিযোগিতাটি উপভোগ করতে পুটিমারি বিলে শিশু-কিশোর, বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষসহ প্রবীণদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। আয়োজকদের ধারণা, মেলা প্রাঙ্গণে প্রায় ১০ হাজার দর্শকের সমাগম ঘটেছে।
প্রতিযোগিতার প্রধান আয়োজক সরোয়ার হোসেন এই প্রতিনিধিকে জানান, প্রায় অর্ধশত বছর ধরে এই বিলে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সবার সহযোগিতায় এবারও অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে এর আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। দেশের যুবসমাজ যেন নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে না যায়, মূলত সেই উদ্দেশ্যেই এই প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারা বজায় রাখা হচ্ছে।
খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য মোল্লা এনামুল কবির জানান, এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে নড়াইল, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কয়রা এবং পাইকগাছা থেকে বড় বড় ও নামকরা ঘোড়া নিয়ে আসা হয়েছে। রূপসা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাবেদ হোসেন মল্লিক বলেন, আধুনিকতার ডামাডোলে আমরা ধীরে ধীরে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে ভুলে যেতে বসেছি। এই মাঠেই স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবছর ঐতিহ্য ধরে রাখতে এই মেলার আয়োজন করেন। ঘোড়দৌড়ের পাশাপাশি আগামীকাল সোমবার (১ জুন) এখানে গ্রামবাংলার আরেক ঐতিহ্যবাহী ‘জারি গানের আসর’ অনুষ্ঠিত হবে। যেখানে বিশিষ্ট জারি গান শিল্পী রিনা ও শাহ আলমের দল গান পরিবেশন করবেন।
ঐতিহ্যবাহী এই ঘোড়দৌড় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াকে টিকিয়ে রাখতে এই ধরনের আয়োজন অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বর্তমান সময়ে যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত রাখতে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কোনো বিকল্প নেই। ঘোড়দৌড় আমাদের গ্রামীণ সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলে। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের শেকড়কে তুলে ধরতে এই আয়োজন আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন।” তিনি একটি মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পি। তিনি বলেন, “আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও এই আয়োজন নতুন প্রজন্মকে আমাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করছে। খেলাধুলা মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটায়। আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ, যারা প্রতিবছর নিরলসভাবে এই ধারা বজায় রাখছেন।”
খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য মোল্লা এনামুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খান জুলফিকার আলী জুলু, জিএম কামরুজ্জামান টুকু, এনামুল হক সজল, জেলা বিএনপির সদস্য শেখ আব্দুর রশিদ, রূপসা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাবেদ হোসেন মল্লিক, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আতাউর রহমান রুনু, জেলা বিএনপির সদস্য নাজমুস সাকিব পিন্টু, আরিফুর রহমান আরিফ, জেলা তাঁতি দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মাহামুদ আলম লোটাস, শ্রীফলতলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি শরিফুল ইসলাম বকুল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: শাহাবুদ্দিন ইজারাদার, শ্রীফলতলা ইউনিয়নের পালেরহাট মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি ও সমাজসেবক সমর কুমার কুন্ডু, সমাজসেবক জাকির হোসেন জমাদ্দার এবং ইপসন বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার মো: সাইফুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপি নেতা শেখ আবুল কালাম এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন শেখ এসকেন্দার আলী, শেখ ইউনুচ আলী, মো: সরোয়ার শেখ ও গোবিন্দ লাল কুন্ডু।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা হুমায়ূন কবীর, মিকাইল বিশ্বাস, দক্ষিণ কোরিয়া বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহাজালাল শান্ত, জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোল্যা আয়ূব হোসেন, সমাজসেবক মোঃ রবিউল ইসলাম, মো: আবু আসলাম শেখ, মোঃ আব্দুর সবুর শেখ, যুবদল নেতা মুন্না সরদার, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দপ্তর সম্পাদক রেজাউল ইসলাম রেজা, সদস্য নয়ন মোড়ল, সেলিম মোল্যা, শাহাজাদা আলমগীর, ছাত্রদল নেতা ইমতিয়াজ আলী সুজন, স.ম শফিকুর রহমান, শাহরুখ হাসান প্রমুখ।
প্রতিযোগিতা শেষে তীব্র লড়াইয়ের পর চূড়ান্ত বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এতে প্রথম স্থান অর্জন করে পাইকগাছার ঘোড়া, দ্বিতীয় স্থান লাভ করে নড়াইলের ঘোড়া এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে লোহাগড়ার ঘোড়া। অনুষ্ঠান শেষে আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।