
নাহিদ জামান- রূপসা
প্রচলিত আছে, “সারাপথে দৌড়াদৌড়ি, খেয়াঘাটে এসে গড়াগড়ি।” রূপসা উপজেলার শিয়ালী ও তেরখাদা উপজেলার শেখপুরা এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই প্রবাদটি এখন এক তিক্ত বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম শিয়ালী-শেখপুরা খেয়াঘাটটি বর্তমানে চরম অব্যবস্থাপনা, নৌযান সংকট এবং যাত্রীসেবার অভাবে এক ভোগান্তির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক নৌকায় বন্দি দুই উপজেলা
রূপসার শিয়ালী এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও বড় মৎস্য আড়ত থাকায় তেরখাদার শেখপুরা এলাকার কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন এই ঘাট ব্যবহার করেন। বিশেষ করে দুই পাড়ের কয়েকশ শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং মৎস্যজীবীদের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই ঘাট। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ঘাটে যাত্রী পারাপারের জন্য রয়েছে মাত্র একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা।
যাত্রীদের অভিযোগ, একটিমাত্র নৌকা হওয়ায় এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যেতে বা নৌকার অপেক্ষায় বসে থাকতে হয় প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট। কখনো কখনো মাঝিকে ঘাটের পাশের দোকানে বসে থাকতে দেখা যায়, ফলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সাধারণ মানুষকে।
ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা ও চিকিৎসা
সকালে স্কুল-কলেজ ও অফিসগামী মানুষের চাপে ঘাট এলাকায় সৃষ্টি হয় বিশৃ/ঙ্খলা। বর্ষা মৌসুমে এই দু/র্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বৃষ্টিতে ভিজে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভেজা পোশাকেই ক্লাসে উপস্থিত হতে হয়। এছাড়া জরুরি রোগী ও বয়স্কদের পারাপারের ক্ষেত্রে এই দীর্ঘ অপেক্ষা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই ঘাটটি নিয়ন্ত্রণ করছে। বিগত সরকারের আমল থেকেই জনপ্রতি ৫ টাকা করে ভাড়া আদায় এবং সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও বর্তমানে আবারও পুরনো অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ফিরে আসছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।
বাজার ও অর্থনীতিতে প্রভাব
শিয়ালী মৎস্য আড়তে প্রতিদিন শেখপুরা এলাকা থেকে লক্ষাধিক টাকার মাছ এই পথেই আনা-নেওয়া হয়। এ ছাড়া কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এলাকার মানুষ মনে করেন, নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিলেও সাধারণ মানুষের এই মৌলিক কষ্ট লাঘবে জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
জনসাধারণের দাবি
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো:
জরুরি ভিত্তিতে ঘাটে অতিরিক্ত ইঞ্জিনচালিত নৌকা সংযোজন করা।যাত্রীসেবায় শৃঙ্খলা ও মাঝিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
ভাড়া আদায়ে স্বচ্ছতা আনা এবং সিন্ডিকেট প্রথা বন্ধ করা।
ঘাটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যাত্রী ছাউনির ব্যবস্থা করা।
প্রশাসনের নিয়মিত তদারকিই পারে হাজারো মানুষের প্রতিদিনের এই চরম ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে—এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণের।