
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
খুলনার কয়রা উপজেলায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের ইট, বালু ও পাথর ব্যবহার করে নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। লোকচক্ষুর আড়ালে অনেক সময় গভীর রাতেও কাজ চালানো হচ্ছে। এতে সেতুটির স্থায়িত্ব নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এরই মধ্যে গত বুধবার সকালে অনিয়মের প্রতিবাদে মহারাজপুর এলাকায় স্থানীয় জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে সেতুর কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ‘উপজেলা সদর থেকে হায়াতখালী জিসি হয়ে গিলাবাড়ি জিসি সড়কের শাকবাড়িয়া নদীর ওপর ৩৬ মিটার আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ২০২২ সালের ৩ আগস্ট ‘এসএ-জেডটি জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাজটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে বর্ধিত মেয়াদের শেষ সময়ে এসেও প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৫৫ শতাংশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ: ‘হাতে চাপ দিলেই ভেঙে যাচ্ছে পাথর’
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল গফফার বলেন,
”সেতু নির্মাণে চরম ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। মানুষ যাতে অনিয়ম ধরতে না পারে, সে জন্য গভীর রাতেও কাজ চালানো হয়। যে পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে, তা হাতে চাপ দিলেই ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমরা কাজ বন্ধ করে দিয়েছি।”
আরেক বাসিন্দা আব্দুল জানান, নির্মাণকাজে বালু ও সিমেন্টের সঠিক অনুপাত মানা হচ্ছে না। এমনকি কাজের স্থানে কোনো তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ডও ঝোলানো হয়নি। প্রকল্পের নকশা বা কাজের শিডিউল দেখতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো অনিয়মের প্রতিবাদ করায় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসী জানান, এর আগেও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে কয়েক দফা কাজ বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর কোনো পরিবর্তন ছাড়াই একই সামগ্রী দিয়ে আবারও কাজ শুরু করা হয়।
দায় এড়ানোর চেষ্টা, কর্মকর্তার দ্বিমুখী বক্তব্য
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. মিরাজ হোসেন বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আমাকে যেভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে, আমি সেভাবেই করছি। এ বিষয়ে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন।”
যোগাযোগ করা হলে উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, “ব্যবহৃত বালু ও পাথর ভালো মানের। নিয়ম মেনেই কাজ হচ্ছে এবং জেলা কার্যালয়ের ল্যাবে সামগ্রী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।”
তবে ল্যাবের পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসার আগেই কেন এই সামগ্রী দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে— স্থানীয়দের এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এই কর্মকর্তা।
সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও সেতুর দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।