
মোস্তফা জামাল পপলু
জলবায়ু পরিবর্তন এবং উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার খেসারত দিচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের নদী-নালা এবং খাল-বিলে আশঙ্কাজনক হারে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় মৎস্য সম্পদে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। একসময় দেশের অভ্যন্তরীণ মাছের চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ পূরণ করা এই অঞ্চলটি এখন মিঠাপানির মাছের জন্য এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। পরিবেশবিদ ও গবেষকেরা একে দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্য খাতের জন্য এক “নীরব ঘাতক” হিসেবে অভিহিত করছেন।
গবেষকদের মতে, লবণাক্ততার এই আগ্রাসন কেবল মাছের উৎপাদনই কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং বহু চেনা দেশীয় প্রজাতিকে ঠেলে দিচ্ছে বিলুপ্তির মুখে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় মানুষের জীবিকা, পুষ্টি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও সৌদি আরবের কিং ফয়সাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, পানিতে অতিরিক্ত লবণের উপস্থিতি মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, প্রজনন ক্ষমতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে কিছু মাছের ডিএনএ গঠনেও পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গেছে, যা দেশীয় মৎস্যকুলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০ বছরে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় ২৬.৬ শতাংশ। শুষ্ক মৌসুমে কপোতাক্ষ, রূপসা ও শিবসা নদীর লবণাক্ততা ২০ থেকে ২৫ পিপিটি (PPT) পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, যা মিঠাপানির মাছের জীবনধারণের জন্য একেবারেই অনুপযোগী।
গুলশা মাছের ওপর প্রভাব: গবেষণায় দেখা গেছে, পানিতে মাত্র ১০ পিপিটি লবণাক্ততা বাড়লে গুলশা মাছের বেঁচে থাকার হার ৯৮ শতাংশ থেকে কমে ৮৭ শতাংশে নেমে আসে। একই সাথে মাছের দৈহিক গঠন ও উজ্জ্বলতা নষ্ট হওয়ায় বাজারে এর মূল্য কমে যাচ্ছে।
হুমকিতে যেসব প্রজাতি: একসময়ের পরিচিত গুলশা, ট্যাংরা, খলিশা, পুঁটি, সরপুঁটি, রানী মাছের পাশাপাশি রুই, কাতলা, মৃগেল, আইড়, পাবদা, রিটা ও বাঘাইড়ের মতো অন্তত ৩০টিরও বেশি দেশীয় প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরে দক্ষিণাঞ্চলের উন্মুক্ত জলাশয়ে মিঠাপানির মাছের উৎপাদন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিলে-বাওড়ে নোনা পানি প্রবেশের ফলে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব মতে, এর ফলে প্রতিবছর উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার মাছের পোনা নষ্ট হচ্ছে।
পেশা হারাচ্ছেন জেলেরা, আর্থিক ক্ষতি ১২০০ কোটি টাকা
মৎস্য সম্পদের এই আকাল সবচেয়ে বেশি আ/ঘাত করেছে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়কে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, এ অঞ্চলের প্রায় আড়াই লাখ নিবন্ধিত জেলের মধ্যে ২০ শতাংশই সাময়িক বেকারত্বের শিকার। গত ৫ বছরে খুলনা ও সাতক্ষীরার প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ মৎস্যজীবী বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকায় চলে গেছেন। মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ অঞ্চলে বছরে প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা। মৎস্য ব্যবসা, পরিবহন, বরফকল ও আড়তসহ পুরো স্থানীয় বাজার ব্যবস্থা এর ফলে ধুঁকছে।
পুষ্টির সংকট: বাড়ছে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি
মাছের ঘাটতি উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তাকে বড় ধরণের হুমকিতে ফেলেছে। বিবিএস-এর ‘খানার আয় ও ব্যয় জরিপ’ অনুযায়ী, গত ৩ বছরে এই অঞ্চলে মাছের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষের দৈনিক আমিষ গ্রহণের পরিমাণ ৫২ গ্রাম থেকে কমে মাত্র ৩৮ গ্রামে নেমে এসেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, পুষ্টিহীনতার কারণে উপকূলীয় এলাকায় শিশুদের খর্বাকৃতি হওয়া এবং গর্ভবতী নারীদের রক্তস্বল্পতার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে উপকূলের জেলেরা দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের জালে আটকা পড়ছেন। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন নদী থেকে মাছের রেণু সংগ্রহ করা হাজারো নারী। ফলে উপকূলীয় পরিবারগুলোতে চরম দারিদ্র্য ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও পরিবেশবিদেরা জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন:
১. দ্রুত লবণাক্ততা সহনশীল মাছের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা।
২. নদী খননের মাধ্যমে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি করা।
৩. স্লুইস গেট ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
৪. উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পানি ও মৎস্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর টেকসই উদ্যোগ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের দক্ষিণাঞ্চল এক ভয়াবহ আর্থ-সামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।