আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
শারীরিক কোনো প্রতিবন্ধকতাই যে মানুষের স্বপ্নের সীমানাকে বেঁধে রাখতে পারে না, তার এক অনন্য ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছেন ব্রিটিশ প্যারাঅলিম্পিয়ান জন ম্যাকফল (John McFall)। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছর (২০২৭) বেসরকারি মহাকাশ স্টেশন 'হ্যাভেন-১' (Haven-1)-এ করে পৃথিবীর কক্ষপথে পাড়ি জমাবেন তিনি। এর মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম 'প্যারানট' বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত নভোচারী হিসেবে মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে নাম লেখাতে যাচ্ছেন এই অর্থোপেডিক সার্জন।
১৯ বছর বয়সে এক মর্মা/ন্তিক মোটরসাইকেল দুর্ঘ/টনার শিকার হন জন ম্যাকফল। দুর্ঘট/নায় তিনি তাঁর ডান পা হারান। তবে এই বিশাল ধাক্কা তাঁর জীবনের গতি থামিয়ে দিতে পারেনি। কৃত্রিম পা (Prosthetic leg) নিয়েই তিনি ট্র্যাকে নামেন এবং ২০০৮ সালের বেইজিং প্যারাঅলিম্পিকে ১০০ মিটার দৌড়ে ব্রিটেনের হয়ে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন।
ক্রীড়াবিদ হিসেবে সফলতার পাশাপাশি তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং পরবর্তীতে একজন দক্ষ অর্থোপেডিক সার্জন হিসেবে চিকিৎসা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন।
২০২১ সালে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ESA) একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেয়। তারা মহাকাশ গবেষণায় অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিরা মহাকাশযানের ভেতরে কীভাবে খাপ খাইয়ে নেন তা পরীক্ষা করতে ‘প্যারানট সম্ভাব্যতা প্রকল্প’ (Paranaut Feasibility Project) চালু করে।
এই প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাপী আবেদন করা ২২,০০০ প্রার্থীর মধ্য থেকে কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২২ সালের নভেম্বরে জন ম্যাকফলকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। এরপর থেকে গত কয়েক বছর ধরে তিনি ইএসএ-এর অধীনে কঠোর নভোচারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন।
মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ভ্যাস্ট' (Vast) সম্প্রতি নিশ্চিত করেছে যে, তাদের নির্মিত বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশন 'হ্যাভেন-১'-এ ভ্রমণের জন্য ইএসএ-এর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। স্পেসএক্সের (SpaceX) ফ্যালকন ৯ রকেটের সাহায্যে এই মিশনটি পরিচালিত হবে।
এই মিশন চলাকালীন জন ম্যাকফল মহাকাশ স্টেশনের ভেতরে প্রায় দুই সপ্তাহ অবস্থান করবেন। মাইক্রোগ্রাভিটি বা ভরহীন পরিবেশে কৃত্রিম পা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত বা শারীরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয় কিনা, এবং স্পেসস্যুট বা ক্যাপসুলের ডিজাইনে কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে কিনা—তা পরীক্ষা করাই হবে তাঁর এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য।
জন ম্যাকফলের এই যাত্রা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সফলতাই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই মিশনের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে—সঠিক প্রযুক্তি এবং সুযোগ পেলে শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনো মানুষের জন্যই মহাকাশ জয়ের পথে বাধা হতে পারে না। ভবিষ্যৎ মহাকাশ গবেষণার দরজা এখন সবার জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে।
সূত্র -বিবিসি