ধুপছায়া ডেস্ক :
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার সুন্দরবনের সার্বিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণসহ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার বর্তমান কার্যক্রম ও প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের নানা সম্ভাবনা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিনভর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে খুলনার দাকোপের নলিয়ান ও বাগেরহাটের মোংলায় ব্যাপক আনন্দ ও উৎসাহের সৃষ্টি হয়। সফরের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও কুশল বিনিময় এলাকাবাসীকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মোংলা বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করা। দিনব্যাপী এ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সুন্দরবনের প্রাকৃতির রূপ পর্যবেক্ষণ ও নলিয়ানে কুশল বিনিময়
সকালে হেলিকপ্টারযোগে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট সংলগ্ন সমুদ্র ও পরিবেশগত পরিস্থিতি আকাশপথে ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে তিনি খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন। সেখানে নেমে তিনি পায়ে হেঁটে পন্টুনের দিকে যান এবং ১০টা ৪৮ মিনিটে নৌপথে মোংলার উদ্দেশে রওনা দেন।
নলিয়ান বাজারের মোড়ে অবস্থানরত সাধারণ মানুষের অভিবাদনের জবাবে তিনি হাত নাড়েন এবং অনেকের সাথে করমর্দন করেন। দুর্গম উপকূলীয় এই জনপদে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় অধিবাসীরা আশা করছেন, এই পরিদর্শনের মাধ্যমে তাঁদের এলাকার নদীভাঙন, সুপেয় পানির অভাব ও কাঁচা সড়কসহ নানা সমস্যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বাড়তি গুরুত্ব পাবে। রাষ্ট্রপ্রধানের আগমন ঘিরে নলিয়ান ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়।
নৌঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজ পরিদর্শন
নৌপথে যাত্রা শেষে দুপুর পৌনে ১টার দিকে মোংলার দিগরাজে অবস্থিত নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ 'বানৌজা আবু বকর' পরিদর্শন করেন। নৌঘাঁটিতে মধ্যাহ্নবিরতির পর বানৌজা মোংলার ওয়ার্ডরুম সভাকক্ষে বিভাগীয় ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে এক পর্যালোচনা সভায় অংশ নেন। সভায় উপকূলীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং নতুন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়ে ফলপ্রসূ কথা হয়।
মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও গতিশীলতার নির্দেশ
বিকেল ৩টার দিকে মোংলা বন্দরের জেটি এলাকায় গিয়ে সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি কনটেইনার ইয়ার্ড, জেটি সুবিধাসহ বন্দর সম্প্রসারণের বিভিন্ন কাজ ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে তিনি আমাদানি-রপ্তানি বাণিজ্য দ্রুত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিকায়নের কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেন। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, মোংলা বন্দরের সার্বিক উন্নয়ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে বড় পরিবর্তন আনবে।
প্রটোকল ভেঙে জনতা ও ব্যবসায়ীদের মাঝে
বন্দর পরিদর্শন শেষে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের দিকে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে জড়ো হওয়া জনতার ভালোবাসার জবাবে প্রধানমন্ত্রী নিজের গাড়ি থামিয়ে নেমে আসেন। তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং কুশল বিনিময় করেন। এরপর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাবিত জায়গাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন, যা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা যুগিয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নে নতুন বার্তা
সুন্দরবনের পরিবেশ ও ভারসাম্য রক্ষা করার পাশাপাশি মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্প ও বাণিজ্য প্রসারের যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকারের এই উচ্চপর্যায়ের সফর বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এ সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, স্থানীয় সংসদ সদস্য আমির এজাজ খানসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। দিনভর নানামুখী কার্যক্রম শেষে হেলিকপ্টারে করে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন প্রধানমন্ত্রী।